আধুনিক বাবা ও বর্তমান সমাজ: পিতৃত্বের সংজ্ঞায় পরিবর্তন

সময়ের সাথে বদলেছে বাবার ভূমিকা। আগের সেই গম্ভীর অভিভাবক থেকে আজকের আধুনিক বাবা কীভাবে হয়ে উঠছেন সন্তানের প্রিয় বন্ধু? জানুন পিতৃত্বের বিবর্তন ও নতুন দিনের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে।

পারিবারিক কাঠামোতে বিগত কয়েক দশকে আমূল পরিবর্তন এসেছে। আগের প্রজন্মগুলোতে বাবার ভূমিকা ছিল মূলত একজন শক্ত সামর্থ্য অভিভাবকের, যিনি কেবল শাসনের মধ্য দিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতেন। তৎকালীন সমাজে পুরুষদের শেখানো হতো ভালোবাসা প্রকাশ করতে হয় কেবল কাজের মাধ্যমে। মনের গহীনে থাকা গভীর আবেগগুলো তাদের হৃদয়েই থেকে যেত, যা কখনো মুখে প্রকাশ করা হতো না। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা দেখব, পিতৃত্বের চিরাচরিত ধারণা কি এখনো একই আছে, নাকি আমরা সেই পুরনো ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি।

সনাতন পিতৃত্বের সেই চেনা ছবি

ঐতিহ্যগতভাবে পিতৃত্বকে একটি কঠোর ফ্রেমের মধ্যে দেখা হতো। বাবা মানেই পরিবারের ‘মাস্টার’ বা প্রধান উপার্জনকারী। তিনি সবার প্রয়োজন মেটাবেন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেবেন—ব্যাস, এটুকুই ছিল তার প্রধান পরিচয়। এই কাঠামোর মধ্যে বাবার ভালোবাসা বা মানসিক টানকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হতো না।

একজন বাবা সবসময় পরিবারের নেপথ্যে থেকে কাজ করে যান। তার আত্মত্যাগ অনেক সময় লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যায়। অথচ তাকে ছাড়া পুরো পরিবারের ভিত ধসে পড়া ছিল অবধারিত। বাবারা সাধারণত নিজেদের ভয়, সংশয় এবং শোক আড়াল করে রাখতেন। কারণ সে সময় আবেগ প্রকাশ করাকে ‘পুরুষোচিত নয়’ বলে মনে করা হতো। ফলে স্ত্রীর সঙ্গেও এক ধরনের দূরত্ব বজায় থাকত।

আধুনিক বাবার সংগ্রাম ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

পুরনো দিনের সেই চেনা গল্পের বিপরীতে আধুনিক বাবা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বর্তমান সময়ের বাবারা কঠোর অনুশাসনের চেয়ে সন্তানের সাথে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক গড়তে বেশি আগ্রহী। তারা এখন কেবল কাজের মাধ্যমে নয়, বরং সরাসরি কথা ও আচরণের মধ্য দিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করতে শিখছেন।

বর্তমানে নারী-পুরুষের সমঅধিকার ও জেন্ডার রোলের বিবর্তনের ফলে বাবারা এখন অনেক বেশি যত্নশীল। তবে সমাজ এখনো পুরোপুরি এই পরিবর্তন গ্রহণ করতে পারেনি। আমরা মুখে সমতার কথা বললেও, অবচেতনভাবে বাবার কাছে সেই পুরনো ‘গম্ভীর অভিভাবক’ মূর্তিটিই আশা করি। তাকে যেমন অর্থনৈতিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করতে হয়, ঠিক তেমনি একজন আবেগী কেয়ারগিভার হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করতে হয়।

পরিবর্তনের পথ ও আগামীর প্রত্যাশা

একজন বাবাকে আজ মাল্টিটাস্কার হতে হচ্ছে। কিন্তু পিতৃত্বকে কেবল একটি কর্তব্যের তালিকা হিসেবে দেখলে চলবে না। আমাদের উচিত পিতৃত্বকে একটি মানবিক সম্পর্ক হিসেবে দেখা। যেখানে একজন পুরুষ তার আবেগ, দুর্বলতা এবং ভালোবাসা কোনো সংকোচ ছাড়াই প্রকাশ করতে পারবেন।

বাবা হওয়া মানে কেবল অর্থ যোগান দেওয়া নয়; বরং এটি হলো মায়া, মমতা এবং উপস্থিতির একটি নিরন্তর জার্নি। পরিবারে বাবার ভূমিকা যখন কেবল কর্তব্য পালনের গণ্ডি পেরিয়ে ভালোবাসার নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠবে, তখনই পিতৃত্ব তার প্রকৃত সার্থকতা খুঁজে পাবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top